‘ফকির’ শব্দের আবিধানিক
অর্থ মুসলমান ভিক্ষুক, নিঃস্ব, দরিদ্র, সর্বহারা, সংসার ত্যাগী, মরমী
সাধক। কিন্তু এই আলোচনায় যে ফকিরের কথা তুলে ধরতে চাই তিনি একজন মরমী সাধক।
ফকির তার উপাধি। বাংলাদেশের যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার ৬নং কেশবপুর
ইউনিয়নের পূর্ব সীমানার একটি গ্রামের নাম মাগুরাডাঙ্গা। কেশবপুর সদর থেকে
পাঁজিয়া সড়ক পথে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার পূর্বে গেলেই পাওয়া যাবে
মাগুরাডাঙ্গা গ্রাম। বিল গরালিয়ার উত্তর-পশ্চিম ধার ঘেঁষেই এই গ্রামের
অবস্থান। গ্রামটি অনুন্নত বললেও অত্যুক্তি হয় না। তবে যশোর-খুলনার জেলার
প্রায় প্রতিটি গ্রামের মানুষ এই গ্রামটির নাম জানে। গ্রামটি চেনা বা জানার
বিশেষত্ব হল এই গ্রামেই মাদার ফকিরের বাড়ি। কেউ কেউ মাদার আওলিয়া বলে থাকে।
আবার কেউ কেউ মান্দার ফকিরও বলে। মান্দার ফকিরের নাম অনুসারে মাগুরাডাঙ্গা
গ্রামের নাম মান্দারডাঙ্গাও বলে থাকে। ফকির সম্প্রদায়ের মধ্যে মাদার
ফকিরের দরগা যশোর-খুলনার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দরগা।
কে এই মাদার ফকির
? কোথা থেকে সে এখানে এসেছে ? এ সম্পর্কে খুঁজতে গিয়ে তার উত্তর পুরুষদের
সংগে কথা বলেছি। এই ফকিরের পরিচয় সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারেনি। তবে মাদার
ফকিরের উত্তর পুরুষ, বর্তমান গদিনশিন ফকির নজরুল ইসলাম ফকির জানান, মাদার
ফকিরের আসল নাম কালাপাহাড় ফকির। তিনি একজন পীর-আওলিয়া মানুষ ছিলেন। তার
দরগায় পাঞ্জেগানা ঘর ও ঈদগাহ অবস্থান আজও বিদ্যবান। যেহেতু ফকিরের উত্তর
পুরুষরা তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য দিতে পারছেন না। সেহেতু আমাদের আরও পিছিয়ে গিয়ে ফকিরদের সম্পর্কে ইতিহাসের পাতায় খুঁজতে হবে।
পয়গম্বর হযরত মুহম্মদ (সাঃ) জন্মগ্রহণ
করেন ৫৭০ খৃষ্টাব্দে মক্কা নগরীতে। ৪০ বছর বয়সে অর্থাৎ ৬১০ খৃষ্টাব্দে তিনি
নবুয়াত প্রাপ্ত হন। এরপর ইসলাম ধর্মের প্রচার কার্য শুরু হয়। দীর্ঘ সময়
ধরে মধ্যপ্রাচ্য, রোম ও পারস্যে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাজ চলতে থাকে।
বিদায় হজের পর রাসূল (সঃ) বেশী দিন বেঁচে ছিলেন না। ৭১২ খৃষ্টাব্দে মুহম্মদ
বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানের মধ্যদিয়ে ভারত উপমহাদেশে মুসলিম অভিযান শুরু
হয়। ১০০০ খৃষ্টাব্দে সুলতান মাহমুদ ভারত অভিযান শুরু করেন এবং চলে ১০২৭
খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত। এরপর ১১৯১ও ১১৯২ সালে মুহম্মদ ঘোরি তরাইনের যুদ্ধের
মাধ্যমে ভারতের এক বিরাট অংশ মুসলিম শাসনাধীনে এনে কুতুবুদ্দিন আইবেকের
দায়িত্বে দিয়ে গজনিতে ফিরে যান। ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের
মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয়। বিভিন্ন সময় মুসলিম
বিজেতাদের সংগে অনেক ইসলাম ধর্ম প্রচারক এদেশে আসে এবং ধর্ম প্রচার কাজে
ব্রতী হন। এই সমস্ত ধর্ম প্রচারকগণ এদেশের মানুষের কাছে
পীর-ফকির-দরবেশ-অলি-আওলিয়া তথা আল্লাওয়ালা লোক বলে সাধারণ মানুষদের নিকট
তারা অনেক ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র ছিলেন। ওই সব পীর-ফকির-দরবেশরা
তাদের চরিত্র-মাধুর্য দিয়ে এদেশের সাধারণ মানুষের মন জয় করেছিল।
ভারত উপমহাদেশে আসা এমনই একজন ছিলেন খাজা মঈনউদ্দিন চিশতী (রঃ)।
তিনি চিশতীয়া সিলসিলার প্রবর্তক। ১২০০ খৃষ্টাব্দে তিনি দীন-ইসলাম প্রচারের
জন্য ভারতের আসেন। আজমীরের আনা সাগরের তীরে তিনি আস্তানা গাড়েন। আজমীরে
তাকে ঘিরে নানা অলৌকিক কার্যের গল্প নানাভাবে পল্লবিত হয়ে সর্বত্র বিস্তৃত
হয়েছিল। এখানেই তার দর গা গড়ে ওঠে। তিনি ও তার শিষ্যরা আরবী ভাষায় রচিত
খোদার প্রশংসামূলক গীত বা গান করতেন। এই গানকে বলা হয় “ছামা”।
কথিত আছে, খাজা সাহেবের প্রধান শিষ্য খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী
আল্লার প্রেমে তন্ময় হয়ে ‘ছামা’ গাইতে গাইতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতেন। কোন
কোন সময় তিনি তিন-চার দিন অচেতন হয়ে পড়ে থাকতেন।
পরবর্তীকালে আরও একজন বিশ্ববিখ্যাত পারসিক মরমী সাধক গীত-বাদ্য সহকারে স্রষ্টার আরাধনার সূচনা করেছিলেন। তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ বিন হোসাইন আল বল্খি। যার সাহিত্যিক নাম মৌলানা জালাল উদ্দিন রুমি।
১২০৭ খৃষ্টাব্দে খোরাসানের অন্তর্গত বল্খে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৬ বছর
জীবিত ছিলেন। ১২৭৩ খৃষ্টাব্দ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবি রুমি তার শিষ্যদের
নিয়ে খোদা প্রেমের গান গেতেন ও নৃত্য করতেন। জালাল উদ্দিন রুমির ঘরে যেখানে
তিনি শিষ্যদের নিয়ে খোদাতত্ত্ব আলোচনা করতেন, সে ঘরে একটি স্তম্ভ ছিল।
অনেক সময় খোদাপ্রেমে আত্মহারা হয়ে তিনি সেই স্তম্ভের চারদিকে ঘুরতেন এবং ‘মসনভী’
বলে যেতেন, আর শিষ্যেরা তা লিখে নিতেন। এখানেই তার শিষ্য-দরবেশরা খোদা
প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে চক্রাকারে নাচতে নাচতে বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান করতেন।
দরবেশদের এই চক্রকে ফার্সীতে ‘হালকা’ বলা হয়।
১২০৩/১২০৪ খৃষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহম্মদ-বিন-বখতিয়ার খলজি
বঙ্গ বিজয় করেন। বখতিয়ার খলজি ১৮ জন সহযোদ্ধা নিয়ে অতর্কিত বঙ্গদেশ আক্রমণ
করে বঙ্গ জয় করেন। তখন বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন সেন বংশের রাজা লক্ষণ সেন।
তিনি এই অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে নৌ-পথে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে
পালিয়ে আসেন। তখন হতে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। কেউ কেউ মনে করেন
বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের পূর্বে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দিতে বাবা আদম শহীদ,
শাহ্ সুলতান রুমি, শাহ্ সুলতান মাহিসাওয়ার, শাহ্ মাখদুম দৌলা প্রমূখ
বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। এই সব সুফি-সাধকদের
সম্বন্ধে অনেক প্রচলিত লোক-কাহিনী ও কিংবদন্তী এমন ভাবে প্রচলিত আছে যে,
এমন মনে করাটাই স্বাভাবিক। তবে ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রমানিত হয় যে,
ওই সকল ফকির-দরবেশরা বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের পরই এদেশে এসেছেন।
বাংলাদেশে ব্যাপক হারে ইসলামের প্রচার-প্রসার শুরু হয় হযরত শাহ্ জালাাল
(রঃ) ও হযরত খান-জাহান আলী (রঃ) এদেশে তাদের আগমণের মধ্যদিয়ে। হাজী
শরীয়তুল্লার ভাষায় এটা ছিল “দারুল হরব” অর্থাৎ বিধর্মীর দেশ।
এই সব সুফি সাধক-দরবেশরা এদেশের সাধারণ
মানুষদের, বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষদের ভিতর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সুফি
সাধক-দরবেশদের অমায়িক ব্যবহার, সাদাসিধে জীবনযাপন সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট
করতো। এছাড়াও বর্ণ প্রথার প্রভাবে নিচু শ্রেনীর মানুষ উচ্চ বর্ণের মানুষ
কর্তৃক অহরহ নিগৃহীত হতো। ফকির-দরবেশরা ইসলামের মহান ভাতৃত্বের বাণী সকলের
মধ্যে ছড়িয়ে দিত। ফলে ওই সকল নিগৃহীত মানুষরা অতি সহজেই ফকির দরবেশদের নিকট
আপন মানুষ হয়ে উঠতো এবং সপ্রোনোদিত হয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতো। এদেশে
আসা প্রথম পর্যায়ের সংসার ত্যাগি ফকির-দরবেশরা কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস
করতেন না। তারা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতেন।
পরবর্তীকালে কেউ কেউ আখড়া বা দরগা করে
স্থায়ীভাবে বসবাসের পাশাপাশি ধর্ম প্রচারের কার্য চালিয়ে যেতেন। কোন কোন
এলাকার ফকির দরবেশরা অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। প্রয়োজনে
প্রতিরোধ গড়ে তুলতেন। মুসলমান পীর-ফকির-দরবেশ ছাড়াও হিন্দুদের শাস্ত্রিক
ব্রাহ্মণ, মঠ মন্দিরের মহন্ত, যোগী, সন্নাসীরাও প্রায় একই রকম জীবনযাপন
করতেন। ফকির-সন্যাসীরা সংসার ত্যাগী হলেও তারা আত্মরক্ষার জন্য লাঠি ও
হালকা অস্ত্র বহন করতেন। যখন যারা স্বাধীন চলাচলে বাঁধার সম্মুখিন হতেন
তাঁরা ওই সব অস্ত্র ব্যবহার করতেন।
মুঘল আমল থেকে এই দুই শ্রেনীর মানুষরা কোথাও কোথাও লাখেরাজ বা
নিষ্কর সম্পত্তি পেয়ে ধর্মীয় জীবন যাত্রায় অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করতেন।
তাদের এই স্বাধীনতায় ব্যত্যয় ঘটে বৃটিশ শাসনামলে। বৃটিশ সরকার ফকিরদের
মুষ্টি ভিক্ষাকে বেআইনি ঘোষণা করে এবং ফকিরদের ডাকাত-দস্যু বলে আখ্যায়িত
করে। ফলে বৃটিশদের সাথে তাদের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই সংঘর্ষ বিভিন্ন
সময়, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন রুপে ফুটে ওঠে। মুসলমান ফকিরদের বিদ্রোহের
নেতৃত্ব দেন ফকির মজনু শাহ্ এবং সন্ন্যাসীদের নেতৃত্ব দেন ভবানী পাঠক।
১৭৬০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত উত্তর বঙ্গের বর্ধমান, রাজশাহী, ময়মনসিংহ,
ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, বিহারের কানপুর প্রভৃতি অঞ্চলে ব্যাপক বিদ্রোহ
দেখা দেয়। বিভিন্ন স্থানের সংঘর্ষে ইংরেজ সিপাহিরা পরাজিত হয়।
ফকির-সন্যাসীদের হাতে লেফটেন্যাণ্ট কিথ এবং ক্যাপটেন টমাস নিহত হন। ফকির
মজনু শাহের মৃত্যুর পর ফকিরদের নেতৃত্ব দেন মুসা শাহ্, চেরাগ আলি শাহ্,
সোবাহান শাহ্, মাদার বকস, করিম শাহ্ প্রমূখ। এ সময় ফকিদের ভিতর নেতৃত্বের
কোন্দল, আন্দোলনের উদ্দেশ্যহীনতা ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ফকিররা ইংরেজ
সেনাবাহিনী কর্তৃক পরাজিত হয়। নেতৃত্বদানকারী অনেকে সাজাপ্রাপ্ত হন। বাকীরা
পালিয়ে নিরাপদ এলাকায় আত্মগোপন করেন। কেউ কেউ দূর-দূরান্তে গিয়ে দীর্ঘ
আত্মগোপনে থেকে নাম পরিবর্তন করে পরবর্তী সময়ে আখড়া বা দরগা প্রতিষ্ঠার
মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে তারা তাদের সীলসিলা পরিবর্তন করেতন না।
ফকিরদের একটি সম্প্রদায় হলো মাদারিয়া ফকির সম্প্রদায়। উত্তর বঙ্গের ফকিরদের প্রধান আড্ডা ছিল বিহারের কানপুর জেলার মাখনপুর গ্রামে। মাদারিয়া ফকির সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা জিন্দা শাহ্ মাদারের
দরগা এই গ্রামে। ওই দরগা হতে ফকিরেরা বংলাদেশে আসতো মুষ্টি সংগ্রহ এবং
বাংলায় অবস্থিত বিভিন্ন দরগা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে। এদের সাথে জুটে যেত
ভবঘুরে ফকিররা। এরা ছিল ভ্রম্যমান ও সংসার ত্যাগী। মাদারি ফকিররা সংসার
ত্যাগী ছিল না। তারা স্থায়ী দরগা স্থাপন করেও আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করতেন।
ধারণা করা যায় মাগুরাডাঙ্গার মান্দার ফকির(কালা পাহাড়) এই সীলসিলার অন্তর্ভূক্ত।
এই দলের বিখ্যাত ফকির ছিল বলাকি শাহ।
তার জন্মস্থান ছিল বাখরগঞ্জ জেলার সেলিমাবাদ পরগনার ঘাগড়ী গ্রামে। বলাকি
শাহ্ অন্যান্য ফকিরদের ন্যায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন সত্য। তবে
অন্যান্য ফকিরদের ন্যায় নিজেদের কর্মকাণ্ডে বাঁধা দেওয়ার জন্য নয়; বরং
বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সচেতন রাজনৈতিক সংগ্রাম। ১৭৯২ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে
এক রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে বলাকি শাহ্ পরাজিত ও বন্দী হয়ে আজীবন করাদণ্ডে
দণ্ডিত হন। তার অনুসারি পরাজিত ফকিররা ইংরেজদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে
দূর-দূরান্তে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে।
কখন
ও কিভাবে মাদার ফকির মাগুরাডাঙ্গায় আসে তার সঠিক কোন বিবরণ জানা যায় না।
তবে বিভিন্ন ইতিহাস পর্যালোচনা করে আনুমানিকভাবে ধারণা করা যায় উনিশ শতকের
প্রথমার্ধে মাদার ফকির হরিহর নদী পথে সপরিবারে এসে মাগুরাডাঙ্গা গ্রামে
আস্তানা গাড়েন। এখানে তিনি তার দরগা গড়ে তোলেন। শুরু করেন জনহিতকর কার্য।
পুকুর খনন, পুল-কালভার্ট নির্মাণ, চিকিৎসা সেবা প্রদান প্রভৃতি ছিল তার
জনহিতকর কাজ। নিঃসন্তান কালাাহাড় ফকির (মাদার ফকির) জনহিতকর কাজের পাশাপাশি
আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে সাধারণ শ্রেণির মানুষের ভক্তির ও শ্রদ্ধার স্থান
দখল করেন।
কালাপাহাড় ফকিরের বার রবিবার ও বৃহষ্পতিবার।
প্রতি সপ্তাহে রবিবার ও বৃহস্পতিবার অসংখ্যা মানুষ বাস, পিকআপ, ভ্যান,
গরুর গাড়ী, ঘোড়ার গাড়ী ইত্যাদি পরিবহনে করে এই দরগায় আসে। দরগা ও থানে আগত
মানুষরা গদিনসিন ফকিরের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করে থাকে। ফকিরের
দরগায় হাজিরা দিয়ে ফকিরের অনুমতি নিয়ে ফকির বাড়ির আশ-পাশে সুবিধা মত জায়গায়
সংগে আনা পশু-পাখি জবাই করে রান্নাবান্নার পর প্রথমে ফকিরের দরগায় উৎসর্গ
করে আনন্দঘন পরিবেশে সবাই মিলে-মিশে খাওয়া-দাওয়া করে নিজ নিজ বাড়িতে
খুশিমনে ফিরে যায়। এই দরগায় হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃষ্টান সকল ধর্ম ও
বর্ণের লোক আসতে পারে। প্রতি বছর চৈত্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ফকির বাড়িতে মেলা বসে।
ওই রাতে দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ ফকিরের দরগায় হজিরা দিয়ে রাত জেগে
জিকির-আজগার করে সারা রাত অতিবাহিত করে থাকে। সারারাত জিকির আজগারের পর
সকালে ফকিরের পুকুর থেকে গোসল করে ফকিরের অনুমতি নিয়ে যার যার বাড়িতে ফিরে
যায়। এছাড়াও প্রতি বছর ২৪ শে অগ্রহায়ন কালাপাহাড়(মাদার) ফকিরের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। মাদার ফকির সম্পর্কে তাঁর ভক্তদের কাছে অনেক কিংবদন্তী শোনা যায়।
নিঃসন্তান কালাপাহাড় ফকির(মাদার ফকির) তার ভাগিনা পাথরঘাটার(সাঞ্চিডাঙার) হাবিবুল্লাহকে প্রতিপালন করেন। পরবর্তিতে মাদার ফকির তাকেই উত্তরাধিকারী করে যান। এ সময় কালাপাহাড় ফকিরের সম্পত্তির পরিমাণ ছিল দুই শতাধিক বিঘা।
হাবিবুল্লাহ ফকিরের দুইটি পুত্র সন্তান হয়। বড় ছেলে, আব্দুল করিম ফকির ও
ছোট ছেলে হাজের আলি ফকির। আব্দুল করিম ফকিরের ৮ ছেলে (১) লুৎফর ফকির (২)
জলিল ফকির (৩) নজরুল ফকির (৪) মনসুর ফকির (৫) গোলাম রসুল ফকির (৬) আয়ুব
হোসেন ফকির (৭) আবু মুছা ফকির ও (৮) আবু ইছা ফকির। ৩ (তিন) মেয়ে। মনজুরা ও
তানজুরা। এক মেয়ে শিশু কালে মারা যায়।
ছোট
ছেলে হাজের আলি ফকিরের ৬(ছয়) ছেলে। (১) অলিয়ার ফকির (২) লালাল ফকির (৩)
হযরত ফকির (৪) আঃ রহিম ফকির (৫) মাজারুল ফকির ও (৬) আজারুল ফকির। ৪ (চার)
মেয়ে। সহরজান, মোহরজান, আঞ্জিরা, ও লাইলি। বর্তমান গদিনশিন ফকিরের দায়িত্ব
পালন করছেন আব্দুল করিম ফকিরের সেজ ছেলে নজরুল ইসলাম ফকির; হাজের আলি
ফকিরের মেঝ ছেলে জালাল ফকির। প্রতি সপ্তাহে উভয় শাখা থেকে একজন
থানের(দরগার) দায়িত্ব পালন করছেন।
কালাপাহাড় ফকির তথা মান্দার
ফকিরের আধ্যাত্মিকতাকে কেন্দ্র করে অলৌকিকতার অনেক কিংবদন্তী লোকমুখে আজও
প্রচারিত হয়। নিম্নে তার কয়েকটি তুলে ধরার চেষ্ঠা করছিঃ
(ক)
মাদার ফকির তার পুকুর কাটার সময় একদিন শ্রমিকদের হটাৎ করে ডেকে একটি ভারি
জিনিষের সংগে একগাছি কাছি(মোটা দড়ি)/মতান্তরে কলার বাশনা বেঁধে সকলকে ডেকে
বলে ‘খাসি খাস তো কাছি টান’। সকলে এসে কাছি ধরে টেনে সেই
ভারি জিনিসটা পুকুরের পাড়ে তোলে। তোলার পর সকলে ফকিরের কাছে জানতে চায়- তার
এ কথার অর্থ কি ? উত্তরে ফকির জানায় – রানাই দোয়ায় (তিন নদীর মহনা) এক
সওদাগারের নৌকা ঘোলে (ঘুর্ণিয়মান পানিতে ভয়াবহ পানি গহবর সৃষ্টি হয়, এই
গহবরে কোন নৌকা পড়লে মাঝি-মাল্লাসহ নৌকার সলিল সমাধি হয়) পড়েছিল। তখন সে
মাদার ফকিরকে স্মরণ করে তার নৌকা বাঁচলে জোড়া খাঁসি ফকিরের দরগায় দিয়ে আসবে
এই মানত করে। সেই কারণে ফকির সকলকে ডেকে কাছি টেনে তার নৌকা বাঁচিয়ে
দিলেন। ফকিরের কাছ থেকে একথা জানার পর সকলে বিস্মিত হয়। বিকাল হতে না হতে
ঘটনার সত্যতার খবর ফকির বাড়িতে পৌঁছায়। ফকিরের এই অলৌকিক ক্ষমতার খবর তার
সাগরেদদের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে। পরের বারের দিন (রবিবার/বৃহষ্পতিবার) সেই
সওদাগার জোড়া খাঁসি নিয়ে ফকিরের দরগায় হাজির হলে ফকিরের পরামর্শ মোতাবেক
খাঁসি জবাই করে সকলকে খাওয়ালেন।
(খ)
মাদার ফকিরের মতানুসারি কৃষ্ণনগর গ্রামে মহাল্দার বাড়ির এক ব্যক্তি একটি
কাঁঠালের চারা রোপনের সময় মানত করে যদি ওই কাঁঠালের চারাটি বড় হয়ে গাছটিতে
ভাল ও বড় কাঁঠাল হয়, তবে প্রথম কাঁঠালটি মাদার ফকিরের দরগায় দিবে। যথা সময়ে
কাঁঠালের চারাটি বড় হয়ে গাছটিতে একটি মাত্র কাঁঠাল ধরলো। প্রথম ধরা
কাঁঠালটি বড় ও সুন্দর হলো। সাগরেদ তার মানত পুরণের জন্য কাঁঠালটি কেটে
বাড়িতে আনল। সাগরেদ তার স্ত্রীর পরামর্শে কাঁঠালটি লম্বালম্বি সমান করে
চিরে এক ভাগ বাড়িতে রাখলো, অন্যভাগ ফকিরের দরগায় দিয়ে এলো। পরবর্তীতে কালে
ওই কাঁঠাল গাছে যত কাঁঠাল ধরতো প্রত্যেক কাঁঠালে লম্বালম্বিভাবে এক পাশে
কোয়া (কোষ) হতো, অন্যপাশে শুধু ভোতা হতো। এই একটি মাত্র ঘটনার স্বীকারোক্তি
ওই বংশের উত্তর পুরুষ তুষার কান্তি মহাল্দারের ও অজিত কুমার বিশ্বাসের
কাছে থেকে জানা যায়। সে জানায়, সে তার বাবা-ঠাকুরদার কাছ থেকে ঘটনাটি জেনেছে। তবে সে তাদের পুকুর পাড়ে সেই কাঁঠাল গাছটি দেখেছে।
তার বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায়- গাছটিতে প্রথম দিকে কিছু কিছু কাঁঠাল হতো,
পরবর্তী কালে আর কাঁঠাল হতো না। বেশ কিছুকাল পর কাঁঠাল গাছটি মারা যায়।
(গ)
একবার এক ব্যক্তি মাদার ফকিরের ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য বড় আকারের দুটি
কাঁঠাল মাদার ফকিরের নাম করে দরগায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি মোটা
পাটকাঠির দুই প্রান্তে দুটি কাঁঠাল বেঁধে ফকিরের নাম স্মরণ করে বাঁকের
ন্যায় কাঁধে নিয়ে ফকির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং ফকির বাড়িতে এসে সরাসরি
ফকিরের সামনে হাজির হয়। মাদার ফকির লোকটিকে তাড়াতাড়ি কাঁঠাল নামাতে বলেন।
ফকির লোকটিকে ভৎর্সনা করে জানায় তার কাঁঠাল পাটকাঠিতে বেঁধে বয়ে আনার সময়
পাটকাঠি যেন না ভাঙ্গে তার জন্য ফকিরকে খুব কষ্ট করতে হয়েছে।
(ঘ)
মাদার ফকির এক বুড়ি গোয়ালিনির নিকট থেকে গাভীর দুধ জোগান নিতো। একদিন
গোয়ালিনি দুধ দিতে এলো না। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো। এ সময় ফকিরের এক
মুরিদ বুড়ির বাড়িতে গিয়ে দুধ না দেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করায় বুড়ি কান্নাকাটি
করে তার গাভি মারা যাওয়ার কথা জানায়। মুরিদ বুড়িকে তার মৃত গাভির নিকট
নিয়ে যেতে বলে। বুড়ি মুরিদকে সংগে করে মৃত গাভির নিকট নিয়ে যায়। মুরিদ মৃত
গাভীর পিঠে থাবা দিয়ে গাভিকে উঠে ফকিরের জন্য দুধ দিতে বলে। গাভিটি উঠে
দাড়ালে বুড়ি দুধ দোহন করে মুরিদকে দিলে মুরিদ দুধ নিয়ে ফকির বাড়ী চলে আসে।
মুরিদ ফকির বাড়িতে পৌঁছানো মাত্রই ফকির মুরিদকে ডেকে মৃত গাভির দুধ আনার
জন্য তিরষ্কার করে।
(ঙ)
একবার জমিদারের নায়েব পাইক-পেয়াদাসহ মাদার ফকিরের বাড়িতে খাজনা আদায়ের
জন্য আসে। তাদের আসার খবর ফকির অলৌকিকভাবে আগেই জেনে যায়। জমিদারের লোকজন
যখন ফকিরের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন তারা দেখল ফকিরের একটি পা বানির (খেজুরের রস
জ্বালানো বড় চুলা) ভিতর ঢুকানো, সেই পা’টি দাউ দাউ করে জ্বলছে। আর ফকির
দু’হাত দিয়ে দুই জালুয়ার (রস জ্বালানোর পাত্র) উতলে উঠা রস দুই ওড়ং (ওড়কি)
দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
(চ) এক
ব্যক্তি মাদার ফকিরকে মোটেও পছন্দ করতো না। কারণে-অকারনে ফকিরের নামে
কুৎসা রটাত। ফকির তাকে কিছুই বলতেন না। ফলে লোকটির আচার-আচারণ সীমা অতিক্রম
করলো। একদিন সকালে লোকটি ঘুম থেকে দেখে উঠে দেখে তার ঘরের সামনে বড় দুটি
বাঘ শুয়ে আছে। লোকটি বুঝতে পারে এটা মাদার ফকিরের কাজ! তখন লোকটি কৌশলে ঘর
থেকে বের হয়ে ফকিরের নিকট হাজির হয়ে তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান। ফকির
লোকটির সংগে এসে লোকটির ঘরের সামনে শুয়ে থাকা বাঘ দুটির কান ধরে উঠিয়ে দিয়ে
চলে যেতে বলেন। বাঘ দুটি ফকিরের কথামত বনের দিকে চলে যায়। লোক মুখে শুনা
যায় বাঘ ও সাপের উপর কালাপাহাড় ফকিরের প্রভাব ছিল।
(ছ)
কেশবপুরের প্রবীণ লোকদের মুখে মুখে আজও প্রচলিত আছে যে, কেশবপুরের হরিহর
নদীর উপর পুলটি (পুরাতন পুলটি) মাদার ফকিরের পুল নামে পরিচিত। পুলটি
সংষ্কারের জন্য একবার ভাঙ্গার চেষ্টা করা হয়। অনেক চেষ্টা করেও পুলের নিচের
ভিত ভাঙ্গা সম্ভব হয়না। সংস্কার কাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে ফকির স্বপ্নের
মাধ্যমে জানিয়ে দেয় যে পুলের ভিত ভাঙ্গার প্রয়োজন নেই। ওই ভিতের উপর
সংস্কার কাজ করলে কোন ক্ষতি হবে না। পুরাতন পুলটি ফকিরের তৈরী ভিতের উপর
আজও দাঁড়িয়ে আছে।
(জ)
কালাপাহাড় ফকিরের দরগা, থান, ঈদগাহ,পাঞ্জেগানা মসজিদ ও প্রাচীর ঘেরা
মাজারের ৩০/৩৫ ফুট দক্ষিণে প্রায় এক একর আয়তনের পুকুরটি ফকিরের পুকুর
হিসেবে ভক্তদের ভক্তির আরও একটি জায়গা। এই পুকুর সম্বন্ধেও কিংবদন্তী
রয়েছে। তবে যেটা বহুল প্রচারিত কিংবদন্তী তা হল- ফকিরের পুকুরে অনেক মাছ
থাকতো। কেউ এসে ফকিরের নিকট মাছ চাইলে ফকির যে সংখ্যা বা পরিমাণ মেরে নিয়ে
যাওয়ার কথা বলতো, ঠিক ততো সংখ্যা বা পরিমাণের বেশী মাছ ধরতে কেউ পারতো না।
এ রকম আরও অনেক কিংবদন্তী ফকিরের নামে
শোনা যায়। যার ঘটনার স্থান, কাল, পাত্র মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে ঘটনার
ব্যাপারটি তারা শুনেছেন বা জেনেছেন একথা প্রায় সকলেই স্বীকার করে। সারা বছর
প্রতি রবিবার ও বৃহষ্পতিবার ৩/৪ শত লোকের সমাগম ঘটে থাকে। মাদার ফকিরের
নাম শোনেনি এমন লোক যশোর-খুলনায় খুঁজে পাওয়া ভার। ফকিরের দরগায় আসা লোকদের
এবং ফকিরদের কাছ থেকে জানা যায় যে সকল ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ দরগায় আসে
তার সংখ্যা গুরু হল অসুখ-বিসুখ ও মেয়েদের বন্ধ্যাত্ব। দরগায় আসা লোকেরা যে
যার ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে বাজি-বাজনা নিয়েও সদলবলে আসতো। সাম্প্রতিক সময়ে
সুন্নি মতবাদের প্রভাবে পূর্বের অসম্প্রদায়িক চেতনা অনেকটা লোপ পেয়েছে।
বর্তমান গদিনশিন ফকির নজরুল ইসলাম ফকির জানান, তাদের
ফকিরি মতবাদ অসম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। অসংখ্য মেয়ে-পুরুষরা তাদের
মনষ্কামনা পুরণের জন্য ফকিরের থানে বটবৃক্ষের সাথে ইটের টুকরো ঝুলিয়ে রাখে।
যারা ফকিরের দরগায় আসে তারা এবং গদিনশীন ফকিরাও বিশ্বাস করে থানের
মাহাত্ম্যে দরগায় আগমণকারীদের মনঃবাঞ্চা পুরণ হয়ে থাকে।
লুৎফর ফকির জানায়, বর্তমান
ফকিরদের নিজেদের কোন ক্ষমতা নেই। তারা যে ব্যবস্থাপত্র দেয় তা হল-থানের
বটগাছের অস্তিবিশেষ দিয়ে মাদুলি পুরে দেওয়া, আর থানের মাটি ও পুকুরের পানি
পড়ে দেওয়া। তাতেই ভক্তদের মনোবাঞ্চা পূরণ হয়ে থাকে।
মাদার
ফকিরের তিন কক্ষ বিশিষ্ট পাকা দরগাটি আজও কিছুটা জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে
আছে। এই পাকা দরগাটিকে তারা পাক-পাঞ্জা বলে থাকে। এই পাকা ঘরটিকে তারা মা
ফতেমার ঘর বলে থাকে। সেখানে ভক্ত-অনুরাগিরা দুধ-কলা দিয়ে থাকে। দালানের
সম্মুখভাগে খিলানের উপর অনেক কারুকার্যের মধ্যে ফণাবিশিষ্ঠ দুইটি সাপের
কারুকার্য রয়েছে। এটাকে তারা রাগ-রাগিনী বলে থাকে। পাকা থান ঘরের ভিতরের
কক্ষের সংগে পূর্ব দেওয়াল সংলগ্ন একটি কুঠির রয়েছে। যেটির নাম অন্ধকোটা।
ছোট্ট একটি দরজা দিয়ে অতি নিচু হয়ে এই ঘরটিতে প্রবেশ করতে হয়।
আমি ফকিরদের অনুমতি নিয়ে টর্চ নিয়ে অন্ধকোটাতে ভয়ে ভয়ে ঢুকলাম। এই ঘরটিতে
কোন দরজা জানালা নেই। ঢোকার ছোট্ট দরজাটি বন্ধ করলে এখানে গাঢ় অন্ধকার।
ভিতরে ছোট দুটি কুঠির। একটি কুঠিরে কোন রকমে বসা যায়। এই কুঠিরের সংলগ্ন আর
একটি কুঠির আছে। সেই কুঠিরটি উত্তর-দক্ষিণ লম্বালম্বি। দেখতে অনেকটা
সিন্ধুক কবরের মতো। দুটি কুঠিরের কোনটাতে দাঁড়ানোতো দুরের কথা, হাঁটু গেড়ে
দাঁড়ানো যাবে না। গোলাম রসুল ফকির জানান এই অন্ধ কুঠিতে বসে কালাপাহাড় ফকির
ধ্যান-সাধনা করতেন। এই অন্ধ কোঠার দরজার মুখেও ভক্তরা দুধ-কলা দেয়। গোলাম
রসুল ফকির জানান এই ঘর ও তার আশপাশ ঘিরে একসময় অনেক সাপের আনাগোনা ছিল।
কিন্তু ওই সাপগুলি কাউকে কামড়াতো না। ফকিরের দালান-বাড়ির অন্ধকোটা
সম্পর্কেও অনেক কিংবদন্তী আছে।
পাকা ঘরটি সম্পর্কে নজরুল ফকির জানান, বাড়িটি কালাপাহাড় ফকিরের সময়ে নির্মিত। বাড়িটির নির্মাণ সম্পর্কে অধ্যাপক মতিউর রহমান তাঁর কপোতাক্ষ থেকে সালতার জনপদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বাড়িটি
পাঁজিয়ার জমিদার রাজা পরেশ নাথ বসু নির্মাণ করে দেন। বিষয়টি গোলাম রসুল
ফকির ও নজরুল ইসলাম ফকিরের গোচরে আনলে তারা তা অস্বীকার করেন। ফকিরের পাকা
দরগা ও থানঘর ঘিরেই ভক্তদের মূল ভক্তির জায়গা।
দরগা, থানঘর, বটগাছ(পাপুড়) বসবাসের
জায়গাসহ সকল জমি-জিরাত গাতীদার প্রফুল দত্তের। বটগাছ সংলগ্ন থানঘরের দক্ষিণ
পার্শের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা পাঁচটি কবর রয়েছে। পূর্ব সারিতে থানঘর সংলগ্ন
প্রথম কবরটি ফকিরের মায়ের কবর। এই কবরের পায়ের দিকে অর্থাৎ দক্ষিণ পার্শের
সবচেয়ে বড় কবরটি কালাপাহাড় ফকিরের, তার দক্ষিণে ফকিরের স্ত্রীর কবর। এই
সারির পশ্চিম পার্শ্বের সারিতে আরও দুটি কবর রয়েছে। উত্তর পার্শ্বের কবরটি
হাবিবুল্লাহ ফকিরের এবং এই কবরের দক্ষিণে তার স্ত্রীর কবর। এ ছাড়া বাকী
প্রায় ১০ কাঠা জমি খোলা জায়গা। যেখানে দরগা বা থানে আসা ভক্তরা অবস্থান করে
থাকে। খোলা জায়গার দক্ষিণে মাঝারি গোছের একটা পুকুর। এই পুকুরের উত্তর ও
পশ্চিম পাড়ে বাঁধান পাকা শানের ঘাট। কালাপাহাড় ফকির তথা মাদার ফকিরের দরগা
নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিমদের মিলনমেলা হিসেবে আজও বিদ্যমান। বর্তমানে
সুন্নী মতাদর্শের কারণে পূর্বের ন্যায় দরগাঁয় নিরপেক্ষ ও সার্বজনীন মতাদর্শ
ফিকে হয়ে গেছে। সনাতন ধর্মালম্বীদের এখন ঢোল-ডাগী, বাজী-বাজনা বাদ দিয়ে
দরগায় আসতে বলা হয়।
এই ফকিরি মতাদর্শের অনুসারি আশপাশ কোথাও আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ফকির বলেন, তার
জানা মতে তাদের মতাদর্শের আশপাশে কেউ নেই। একই প্রশ্নের উত্তরে গোলাম রসুল
ফকির সহমত পোষণ করেন। পাশাপাশি মনিরামপুর উপজেলার কাটাখালি গ্রামে
শাহ্মান্দারের দরগা বলে একটি দরগা আছে বলে তিনি জানান। তবে তাদের সংগে
মাগুরা ডাঙ্গার ফকিরের কোন যোগসূত্র নেই।
মণিরামপুরের
কাটাখালি দরগায় আগমনকারীদের অনেকেই বলে থাকে শাহ্ মান্দার কেশবপুরের
কাঁলাপাহাড়(মান্দার) ফকিরের আপন ভাই। ভিন্ন মতও আছে। কাটাখালি গ্রামের
সন্তোষ কুমার মণ্ডল (৮৩)। তিনি জানান, প্রায় ৬৫ বছর যাবত এই দরগায়
দোকানদারি করে থাকেন। তিনি তার বাবা-ঠাকুরদার কাছ থেকে জেনেছেন,
শাহ্মান্দার ১২০৬ সালে ইরান দেশ থেকে এদেশে আসেন। তিনি বার আওলিয়ার সংগে
এদেশে আসেন। তিনি একজন সাধক পীর ছিলেন। তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারি
ছিলেন।
তিনি আরও জানান, কেশবপুরের মাগুরাডাঙ্গার
মান্দার ফকিরের সংগে কাটাখালির শাহ্ মান্দারের ভাই হওয়া সম্ভাবনা নেই।
কেশবপুরের কালাপাহাড় ফকিরের আবির্ভাব শাহ্মান্দারের অনেক পরে। সমোসকাটি
গ্রামের প্রাক্তন চেয়ারম্যান শিবপদ রায় (৭১) শাহ্ মান্দারের অনেক অলৌকিক
কাহিনীর বর্ণনা করেন এবং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান
শিক্ষক কার্ত্তিক চন্দ্র রায় (৯৫) শাহ্ মান্দার দরগা জাগ্রত বলে অভিহিত
করেন। মাগুরা ডাঙ্গায় বার্ষিক অনুষ্ঠানাদি হয়ে থাকে। কালাপাহাড়ের বর্তমান
উত্তরসূরিগণ তাদের সংগে শাহ্ মান্দারের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। উভয়
দরগায় নিয়ম-রীতির ক্ষেত্রে মিল ও অমিল লক্ষ্য করা যায়।
মিলগুলিঃ
(১) উভয় দরগার বারের দিন রবিবার ও
বৃহষ্পতিবার। (২) উভয় স্থানের ব্যবস্থা পত্রের মূল ভিত “বিশ্বাস”
ব্যবস্থাপত্রের প্রকৃতিও এক (থানের মাটি, পুকুরের পানি)। মেয়েরা দরগায়
গাছের নিচে শাড়ির আঁচল পেতে ফল-ফুল-পাতা যাই কাপড়ের আঁচলে পড়ুক, সেটা তাদের
মনোবাঞ্চা পূরণ হওয়ার ইঙ্গিত মনে করে। এ ছাড়া মনোবাঞ্চা পূর্ণ করতে গাছে
ইট বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে। (৩) উভয় দরগায় সকল ধর্ম ও বর্ণের লোকের জন্য
উন্মুক্ত। (৪) উভয় দরগা সম্পর্কে কিংবদন্তী রয়েছে। (৫) উভয় দরগায় একটি
গাছকে মান্য করার রেওয়াজ আছে। মাগুরা ডাঙ্গায় বটগাছ(পাপুড়), শাহ্মান্দারে
নিমগাছ। (৬) উভয় দরগায় ভক্তদের আর্থিক দান গ্রহনের জন্য দান বাক্স রাখা
আছে। সেই অর্থ দ্বারা দরগার উন্নায়ন করা হয়।
অমিলগুলিঃ
(১) মাগুরা ডাঙ্গায় গদিনশিন ফকিরা
ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকে কিন্তু শাহ্ মান্দার দরগায় এমন কেউ নেই। (২)
মাগুরাডাঙ্গায় পাকা দরগা আছে(পাকপাঞ্জ), কিন্তু শাহ্ মান্দারে পাকা দরগা
নেই। (৩) মাগুরাডাঙ্গায় কালাপাহাড় ফকিরের সমাধি আছে; শাহ্ মান্দার দরগায়ে
শাহ্ মান্দারের সমাধি নেই। (৪) মাগুরাডাঙ্গায় মানতের পশু-পাখি জবাই করে
ফকিরের দরগায় প্রথমে উৎসর্গ করা হয় ; পক্ষান্তরে শাহ্ মান্দারে মানতের
পশু-পাখি দরগায় জীবান্ত ছেড়ে দেওয়া হয়, যে পারে সে ধরে নেয়। (৫) বর্তমানে
মাগুরাডাঙ্গায় ইসলামি চেতনার অনুকুলে দরগায় বাজি-বাজনা করাকে নিষেধ করা হয়;
পক্ষান্তরে শাহ্ মান্দরে কোন বিধি-নিষেধ নেই। (৬) মাগুরা ডাঙ্গায় বার্ষিক
অনুষ্ঠানাদি হয়ে থাকে; শাহ্ মান্দারে বার্ষিক অনুষ্ঠানাদি হয় না। বিভিন্ন
তথ্য থেকে ধারণা করা হয় শাহ্ মান্দার কেশবপুরের বগা গ্রামে আগত শাহ্
কারারিয়ার সমসাময়িক হতে পারে। “শাহ্” উপাধি ধারণকারিরা প্রায় সকলেই ইসলাম
ধর্মের প্রচারক ছিলেন। কাটাখালিতে শাহ্ মন্দারের মাজার না থাকলেও বগা গ্রাম
শাহ্ কারারিয়ার মাজার এখনও সসম্মানে বিদ্যমান। আরও ধারনা করা যায় যে, শাহ্
মান্দার হয়তো কিছু দিন কাটাখালিতে অবস্থান করার পর অন্যত্র চলে যান।
আজ
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানের তথা চিকিৎসা বিজ্ঞানের এত
উন্নতির পরও প্রতিসপ্তাহে দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ বুকভরা ভালবাসা ও
হৃদয়ভরা বিশ্বাস নিয়ে অসুখ-বিসুখ থেকে মুক্তি আর বন্ধ্যাত্বের যন্ত্রণা
থেকে মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়ার জন্য মাদার ফকিরের দরগায় ছুটে আসে। এই সব
মানুষদের দেখে মনে হয় “ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর”।
তথ্যসূত্রঃ
* ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি; মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, মোহাম্মদ ওসমান গনি, মোহাম্মদ লুৎফর রহমান।
* বাংলাদেশের ইতিহাস; ডঃ মহম্মদ আবদুর রহিম, ডঃ আব্দুল মমিন চৌধুরী, ডঃ এ.বি.এম মাহমুদ, ডঃ সিরাজুল ইসলাম।
* তাযকেরাতুল আম্বিয়া; মাওলানা আব্দুর রশিদ।
* তাযকেরাতুল আউলিয়া; ফরিদউদ্দিন আত্তার।
* যশোর-খুলনার ইতিহাস; সতীশ চন্দ্র মিত্র।
* মাগুরাডাঙ্গা দরগা ও শাহ্ মান্দার দরগার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
লেখক পরিচিতিঃ
মোঃ রুহুল আমিন
অধ্যক্ষ পাঁজিয়া ডিগ্রী কলেজ
ডাকঘরঃ পাঁজিয়া, উপজেলাঃ কেশবপুর, জেলাঃ যশোর।
সাংবাদিক ও কলামমিস্ট। মোবাঃ ০১৭১৮-৬১১৫৫০, ই-মেইলঃ ruhulamin0655@gmail.com